Technical Care BD https://www.technicalcarebd.com/2022/07/islami-business.html

ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম

ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম - মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। প্রতিটি বিষয়ে যেন আমরা কোনো কিছু ভুল না করে ফেলি। ব্যবসা করা একটি হালাল পেশা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেও ব্যবসা করতেন। অধিক লাভের আশায় আমরা ভুলে যাই ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম গুলো সম্পর্কে। আর তখন সেটা আমাদের জন্য হারাম আয়ের পন্থা হিসেবে কাজ করে। 

ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম

সূচীপত্রঃ ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম

ইসলাম মানব জীবনের যাবতীয় সকল সমস্যার সমাধান যেমন দিয়েছে ঠিক তেমনি ভাবে করে দিয়েছে হালাল উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করার। আপনি যদি ইসলামিক ভাবে ন্যায় পরায়নতার মাধ্যমে ব্যবসা করতে চান তাহলে আপনাকে জানতে হবে ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম গুলো সম্পর্কে। 

আমাদের আজকের পোষ্টে আমরা জানবো ব্যবসা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে আমাদের। কোন কোন নিয়ম মেনে আমাদের ব্যবসায় নামা উচিৎ। কেউ চায় না কষ্ট করে আয় করা টাকা হারাম করতে। হালাল উপায় ব্যবসা শুরু করতে চাইলে ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে বিস্তারিত জেনে নিন। ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম জানতে লেখাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুনঃ

ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম

ইসলামে বলা হয়েছে হালাল ইনকাম করার জন্য। সেটা আপনি যে কাজই করেন না কেনো। হালাল হলে সব কাজের অনুমোদন ইসলামে দেওয়া আছে। পবিত্র কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে, "হে ইমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং আমি তোমাদের জন্য যা ভূমি থেকে উতপন্ন করেছি তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করতে মনস্থ কর না"। 

উক্ত আয়াত এর অর্থ দ্বারা আমরা বুঝি যে মহান আল্লাহ আমাদের হালাল ভাবে উপার্জন করতে নির্দেশ করেছেন।

ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) এর সুন্নত অনুযায়ী করতে হবে। ব্যবসাটা থেকে যে মাল বা প্রফিট হবে সেটা অবশ্যই পবিত্র হওয়া চাই। অসৎ উপায়ে মানুষকে ঠকিয়ে ধোকা দিয়ে উপার্জন করলে সেটা কখনোই হালাল হবে না। হালাল রুজি অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। মহান আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে এরশাদ করেছেন হে ঈমানদারগণ খাও আমার প্রদত্ত ও পবিত্র জিনিস গুলো। 

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেনঃ হে ইমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ কর না, কেবল তোমাদের একে অপরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ"।

রসুলল্লাহ (সা.) ইসশাদ করেছেন "সত্যবাদী আমানতদার ব্যবসায়ী নবীগণ, সিদ্দিকগণ ও শহীদগণের সঙ্গী হবে। আমাদের অনেক নবী-রাসূলগণই ব্যবসা করে হালাল উপার্জন করতেন। ইসলামিক ভাবে ব্যবসা করার কিছু মূলনীতি রয়েছে" (সহিহ বুখারি)

আরো পড়ুনঃ দ্রুত চাকরি পাওয়ার উপায়

ব্যবসার ক্ষেত্রে কয়েকটি নিয়ম

আপনি যে ধরনের ব্যবসা করেন কাউকে ঠকানো যাবে না। গুনগত সেবা প্রদান এর কথা বলে কোনো প্রকার প্রতারণা করা যাবে না। যদি দোকানি হোন তাহলে ওজনে কোনো প্রকার কারচুপি করা যাবে না। কাস্টমারকে বিভিন্ন ভাবে মিথ্যা বলে কিছু বিক্রি করা যাবে না। প্রতিটি বিষয়ে ইনসাফ করতে হবে। নিজেও লাভ করবেন ক্রেতাকেও ঠকাবেন না। ন্যায্য মূল্য গ্রহক দের থেকে দাবি করবেন।

সৎ পথে উপার্জন এর বরাত দিয়ে রাসুল (সা) বলেন, ‘ফরজ ইবাদতগুলোর নামাজ, রোজা, যাকাত ইত্যাদি এরপরে হালাল উপার্জন ও একটি ফরজ এবং ইবাদতের গুরুত্ব রাখে। (সহিহ বুখারি)। ব্যবসায়ীদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে মহানবী (স) বলেন, সত্যবাদী আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যক্তি কিয়ামতের দিনে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের দলে থাকবেন। (তিরমিজি, হাদিস)

ইসলামে ব্যবসার ফজিলত

ব্যবসা একটি স্বাধীন পেশা। হালাল ভাবে উপার্জন করার শ্রেষ্ঠতম উপায় হচ্ছে ব্যবসা। আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে প্রেরিত রিজিকের ১০ টি অংশের মধ্যে ৯ টি অংশ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যেই বিধ্যমান। 

তবে অবশ্যই ব্যবসা হতে হবে শতভাগ হালাল। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "সত্যবাদী আমার অন্তর ও বিশ্বাসী ব্যক্তি কেয়ামতের দিনে নবীগণ, সিদ্দিকগণ এবং শহীদগণের দলে থাকবেন” (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯) মূলত হালাল রিজিক উপার্জনের জন্য যে পন্থা অবলম্বন করা হয় তাই আল্লাহ তাআলার নিকট পছন্দের। হালাল ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে আমরা সর্বদা হালাল উপার্জন করব এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করব।

ব্যবসা একটি হালাল ইবাদত এর অন্যতম মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। ইসলাম যেকোনো কাজের উপর বাধা প্রয়োগ করে না। আপনি যতক্ষন পর্যন্ত সঠিক ভাবে নিয়ম মেনে রিযিক এর ব্যাবস্থা করবেন তখন সেটা উত্তম ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হবে। পৃথিবীর সৃষ্টি লগ্ন হযরত আদম (আ:) থেকে ব্যবসার শুরু হয়। 

হযরত আদম (আ) নিজে কৃষি কাজ করে জিবিকা নির্বাহ করতেন। মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যবসার উপর বেশি গুরুত্ব দিতে বলছেন, কেননা মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) নিজেও ব্যবসা করতেন। সবচেয়ে উত্তম সেই ব্যাক্তি যে নিজেই উপার্জন করে তার পিতা-মাতা ও পরিবারের জিবিকা নির্বাহ করে।

যত নবী ও রাসুলগণ পৃথিবীতে এসেছেন তারা সকলেই কোনো না কোনো ব্যবসা করতেন। তার থেকেই বুঝা যায় ব্যবসা অনেক উত্তম পেশা ও ব্যবসার ফজিলত ও ব্যাপক। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ করেন- (সত্যবাদী আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যক্তি কিয়ামতের দিনে নবীগণ, সিদ্দিকগণ এবং শহীদগণের দলে থাকবেন। (জামে তিরমিজি) 

ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি আপনি সৎ ভাবে সবকিছু পরিচালনা করতে পারেন তাহলে এটিকে একটি নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাই আমরা যারা ব্যবসা করবো তাদের সকলের উচিত হালাল ভাবে হালাল উপায়ে ব্যবসার করার।

ইসলামে নিষিদ্ধ ব্যবসা

ইসলামে ব্যবসার কিছু মূলনীতি রয়েছে যেগুলো যদি আপনি যদি ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবহার না করতে পারেন তাহলে আপনার ব্যবসা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। সততা হলো যেকোনো ব্যবসা হালাল হওয়ার মূলনীতি গুলোর মধ্যে একটি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন, কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা অপরাধী হিসাবে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করবে, সততা ও ন্যায় নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করবে তারা ব্যতীত’। 

ব্যবসার লাভ কত নিতে হবে বা কত পারসেন্ট পরিমান লাভ্যাংস ধার্য করা হবে এটি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন মাজিদে কিছু বলেনি। কারণ এটি নির্ভর করে দেশ, স্থান ও কালভেদে। যেমনঃ শিতের সিজনে সিজনাল পণ্যের চাহিদা ব্যাপক থাকলেও সেরুপ পণ্য উৎপাদিত হয় না। তখন সেটার লাভ্যাংস্যের পরিমান অনেকটা বেড়ে যায়।

কাউকে না ঠকিয়ে বা প্রতারণা না করে যদি ১০০% লাভ্যাংস ও অর্জন করা হয় তবে সেটা হালাল রুজিতেই অংশ হয়ে যাবে। তবে ব্যবসার সময়ে মূলধন এর চেয়ে পরিবার পরিচালনা, যাকাত ইত্যাদি যে খরচ উঠে আসবে সেটুকু পরিমান লাভ করার নিয়ম রয়েছে বলে মনে করেন ইসলামিক স্কলার গণ।

হাদিসে এসেছে, (নবী করীম (সাঃ)- এর নিকট পশুর একটি চালানের সংবাদ আসল। তিনি আমাকে একটি দীনার দিয়ে বললেন, উরওয়া! তুমি চালানটির নিকট যাও এবং আমাদের জন্য একটি বকরী ক্রয় করে নিয়ে আস। তখন আমি চালানটির কাছে গেলাম এবং চালানের মালিকের সাথে দরদাম করে এক দীনার দিয়ে দুইটি বকরী ক্রয় করলাম। 

বকরী দু’টি নিয়ে আসার পথে এক লোকের সাথে দেখা হয়। লোকটি আমার থেকে বকরী ক্রয় করার জন্য আমার সাথে দরদাম করল। তখন আমি তার নিকট এক দীনারের বিনিময়ে একটি বকরী বিক্রয় করলাম এবং একটি বকরী ও একটি দীনার নিয়ে চলে এলাম। 

তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! এই হচ্ছে আপনার দীনার এবং এই হচ্ছে আপনার বকরী। তখন রাসূল (সা) বললেন, এটা করলে কিভাবে? উরওয়া বলেন, আমি তখন তাঁকে ঘটনাটি বললাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হে আল্লাহ! আপনি তার হাতের লেনদেনে বরকত দিন’)

যে সকল জিনিস গুলো আমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে সে সকল পণ্য বা দ্রব্য নিয়ে কোনো প্রকার ব্যবসা করলে সেটা হারাম ব্যবসা বলে বিবেচিত হবে। যেমনঃ মদের ব্যবসা, মৃত মানুষ, মুর্তি, কুকুরের গোশত, শুকরের গোশত ইত্যাদি। যে সকল জিনিস গুলো ইসলামে সরাসরি হারাম বলে নির্দেশিত হয় সে সকল ব্যবসা কখনোই করতে পারবেন না।

আরো পড়ুনঃ সৌদি আরবের কোম্পানি নাম

ইসলামে ব্যবসার প্রকারভেদ

ইসলামে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে তন্মধ্যে মুদারাবা ব্যবসার পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো ব্যবসার মধ্যে একটি। মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা করা হালাল বলে বিবেচিত হবে। মুদারাবা (আরবিঃ التكافل হল ইসলামি শরীয়াহ সম্মত ১ ধরনের অংশীদারি ব্যবসায় পদ্ধতি।

যেখানে একপক্ষ মূলধন সরবরাহ করে এবং অপর পক্ষ মেধা ও শ্রম দিয়ে উক্ত মূলধন দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করে। যে পক্ষ মূলধন সরবরাহ করে তাকে সাহিব-আল-মাল (صاحب المال) বলে এবং ব্যবসায় পরিচালনাকারীকে বলা হয় মুদারিব (مضارب) বলে। 

এক্ষেত্রে, ব্যবসায়ে মুনাফা হলে পূর্ব চুক্তি অনুসারে বা আনুপাতিক হারে উভয়পক্ষের মাঝে মুনাফা বণ্টিত হয় এবং ব্যবসায় লোকসান হলে মূলধন সরবরাহকারী বা সাহিব-আল-মাল উক্ত লোকসান বহন করে। 

অন্যদিকে, ব্যবসায় পরিচালনাকারী বা মুদারিব তার মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক পায় না, যা তার লোকসান হিসেবে গণ্য হয়। তবে যদি মুদারিব কর্তৃক নিয়ম লঙ্ঘন, অবহেলা বা চুক্তিভঙ্গের কারণে লোকসান হয় তাহলে মুদারিবকেই লোকসানের দায় বহন করতে হয়।

হালাল ব্যবসা আইডিয়া

আপনি কি একজন ইসলাম বিশ্বাসী মানুষ এবং আপনার বিশ্বাসের সাথে খাপ খায় এমন একটি ব্যবসা শুরু করতে চাইছেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে এখানে আমরা আপনার জন্য সেরা হালাল ব্যবসার ধারণা দিয়েছি।

হালাল একটি আরবি শব্দ যার অর্থ বৈধ বা অনুমোদিত। হালালের বিপরীত হল হারাম, যার অর্থ অবৈধ বা নিষিদ্ধ। হালাল এবং হারাম সার্বজনীন শব্দ যা জীবনের সমস্ত দিক নির্দেশ করে। যেহেতু হালাল মানে আরবি ভাষায় অনুমতিযোগ্য, তাই এটি যেকোন পণ্য বা পরিষেবাকে উল্লেখ করা যেতে পারে যা কোনোভাবেই ইসলামী আইন ও সামাজিক নিয়ম লঙ্ঘন করে না।

১। হালাল ঔষধের ব্যবসা ২। কাপড়ের ব্যবসা ৩। হালাল কসমেটিকস ব্যবসা ৪। হালাল ট্যুরিজম ব্যবসা ৫। হালাল খাবার তৈরির ব্যবসা ৬। মুরগির ফার্ম ৭। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ৮। Rent a Car (ভাড়ায় চলিত গাড়ির ব্যবসা)।

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা বাণিজ্য

إن الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه أجمعين أما بعد সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট যিনি আমাদেরকে কুরআন হাদিসের আলোকে জীবন যাপনের তাওফিক দিয়েছেন। দুনিয়াতে এমন কোন কর্ম নাই যার বিধান ইসলামে উল্লেখ হয়নি। আমরা আজকে জানবো কোন পদ্ধতিতে ব্যবসা বাণিজ্য করলে ইহকালীন জীবন কল্যানময় হয় এবং পরকালীন জীবন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভ করা যায়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا অর্থঃ ‘আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে হালাল এবং সূদকে হারাম করেছেন’।

এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, ইসলাম উপার্জনের পেশা হিসাবে হালাল পথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যেমন উৎসাহ দিয়েছে, তেমনি অবৈধ পথে অর্থ-সম্পদ উপার্জন করতেও নিষেধ করেছে। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া গেলেও এর শেষ পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কাজেই অন্যায়, যুলুম, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, মুনাফাখোরী, কালোবাজারী, মওজুদদারী ইত্যাদি অবৈধ ও ইসলাম বিরোধী কার্যাবলী পরিহার করে সততার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে।

আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। হালালভাবে ব্যবসার মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারি। অথচ আমরা ব্যবসার মাধ্যমে মানুষকে ঠকিয়ে/ধোঁকা দিয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের অসন্তুষ্টি অর্জন করছি। শুধু তাই নয় মানবজাতির অভিশাপ, ঘৃনা ও অসন্তুষ্টি নিয়ে আমাদের জীবনকে কুলশিত করছি। কারন এটা হক্কুল এবাদ তথা বান্দার হক। 

যেমন ধরুন কোন এক ক্রেতা আপনার কাছ থেকে কিছু পণ্য ক্রয় করলো, এবং আপনি তাকে ভালো পণ্য বলে খারাপ পণ্য দিলেন বা মাপে কম দিলেন, লোকটি পণ্য নিয়ে চলে গেলেন হয়তো বা আপনার আর কোনো দিন দেখা হলো না। কিন্ত আপনি যদি আপনার নিজের ভুল বুঝার পরে তার কাছে ক্ষমা চাইতে চান তখন কিন্তু আপনি আর তাকে খুজে পাচেছন না, এরকম অসংখ্য ক্রেতাকে ঠকিয়েছেন যাদেরকে আপনি আর খুজে পাবেন না। কিন্তু আপনিতো তাদের কাছে চির ঋনী হয়ে থাকলেন, কেয়ামতের দিন এই ঋন আপনাকে নিঃস্ব করে ফেলবে।

এ মর্মে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে; عن ابى هريرة رضي الله ان رسول الله صلى الله عليه وصلم قال اَتَدْرُوْنَ مَا لْمُفْلِسُ قَالُوْا الْمُفْلِسُ قِيْنَا مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ فَقَالَ اِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ اُمَّتِىْ مَنْ يَأْةِىْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بصَّلَوةٍ وَّصِيَامٍ وَزَكَاَةٍ وَّيَأْتِىْ قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَف هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَ سَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فاِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ اَنْ يَقْضَى مَا عَلَيْهِ اُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِمْ … طُرِحَ فِى النَّار

অর্থঃ আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা কি জান অভাবী কে? ছাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে তো সেই অভাবী যার টাকা-পয়সা ও অর্থ-সম্পদ নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন আমার উম্মতের মধ্যে সেই সবচেয়ে বেশি অভাবী হবে, যে দুনিয়াতে সলাত, সিয়াম, যাকাত আদায় করে আসবে এবং সাথে সাথে সেই লোকেরাও আসবে, কাউকে সে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো মাল-সম্পদ আত্মসাত করেছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে আবার মেরেছে। 

সুতরাং এই হক্বদারকে তার নেকী দেয়া হবে। আবার ঐ হকদারকেও (পূর্বোক্ত হক্বদার যার উপর যুলুম করেছিল) তার নেকী দেয়া হবে। এভাবে পরিশোধ করতে গিয়ে যদি তার (প্রথমতো ব্যক্তির) নেকী শেষ হয়ে যায় তবে তাদের (পরের হক্বদারের) গুণাহসমূহ ঐ ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম: ৬৪৭৩)

আমরা অনেকেই হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হকের ব্যাপারে সচেতন কিন্তু হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হকের ব্যাপারে গাফেল। যেমন; লেনদেনে ধোঁকা, বাটপারি, ছিটারি করা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, কথার অভিশাপ দেওয়া, কথার খোটা বা গালি-গালাজ করা, হিংসা বা নিন্দা করা, হেয় মনে করে, মিথ্যা কথা বলা, কারো প্রতি মিথ্যারোপ করা, অন্যের ছবি বিকৃত করা, অন্যের ক্ষতি করা, কাউকে ধোঁকা দেয়া। 

কারো সাথে প্রতারনা করা, অন্যের অর্থের লোভ করা, গীবত বা পরচর্চা করা, শত্রূতামী করা, যাতায়াত পথে কারো সাথে খারাপ আচরণ করা, যেমন বাসে কারো সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়া, বাসের হেল্পারদের সাথে, মা বোনদের সাথে খারাপ আচরণ করা, প্রতিবেশির সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়া তাদের প্রতি জুলুম করা। 

রাস্তার মাঝে এমন কিছু ফেলে রাখা যাতে মানুষের কষ্ট হয়, মসজিদে ঢুকে মানুষকে কষ্ট দিয়ে সামনের কাতারে যাওয়া, সরকারি সম্পদ লুটে খাওয়া, সরকারি সম্পদের মালিক কিন্তু দেশের সমস্ত জনগণ সুতরাং সরকারি সম্পদ ভক্ষন করা মানে সমস্ত জনগনের সম্পদ খাওয়া, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের সমস্ত জনগণ ক্ষমা না করবে ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ ক্ষমা করবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি।

অর্থাৎ মানুষ মানুষের সাথে সম্পর্কিত যা কিছু আছে তার হক রক্ষা করা বা আদায় করার নামই হলো হাক্কুল ইবাদ তথা বান্দার হক। আর বান্দার হক নষ্ট করলে প্রথমে বান্দার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে সে যদি ক্ষমা করে তখন আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মানুষের জীবনে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত যাবতীয় কার্যকলাপ, আচার-আচরণ বিধি সবই মানুষ মানুষকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। আল্লাহর ইবাদত (যেমন: সলাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি) ছাড়া বাকি সব যা মানুষকে কেন্দ্র করে ঘটে। কত বড় চিন্তার বিষয় ভাবতে পারেন হে মূমিন! মূসলীম!

সুদ হারামঃ সুদ গ্রহণ, সুদ প্রদান উভয়ই লানতপ্রাপ্ত গোনাহ। তাই এ ভিত্তিতে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা জায়েজ নয়। হারাম। হারাম টাকায় ব্যবসাকৃত সম্পদও হারাম হবে। তাই এ কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। হারাম টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করাও বৈধ নয়। তবে যদি না জেনে গ্রহণ করে, তাহলে ব্যবসাটি হারাম হবে না। শুধু টাকা পরিশোধ করে দিলেই ব্যবসাটি হালাল হয়ে যাবে। কিন্তু জেনে শুনে হারাম টাকা দিয়ে ব্যবসা গ্রহণ করে ব্যবসা করা বৈধ নয়।তাই একাজ থেকেও বিরত থাকতে হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا ۗ وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ۚ فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَىٰ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَمَنْ عَادَ فَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

অর্থঃ যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছেঃ ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে – بد الله بن مسعود عن أبيه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال لعن الله آكل الربا وموكله وشاهديه وكاتبه

অর্থঃ হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ এর পিতা থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-“যে সুদ খায়, যে সুদ খাওয়ায়, তার সাক্ষী যে হয়, আর দলিল যে লিখে তাদের সকলেরই উপর আল্লাহ তায়ালা অভিশাপ করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-৩৮০৯, মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস নং-৪৯৮১)

রাসূলুলাহ (সাঃ) বললেন, إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّارًا إِلاَّ مَنِ اتَّقَى اللهَ وَبَرَّ وَصَدَقَ অর্থঃ ‘ক্বিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা অপরাধী হিসাবে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করবে, নেকভাবে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করবে তারা ব্যতীত’। [তিরমিযী, হা/১২১০; ইবনু মাজাহ হা/২১৪৬; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৪৫৮।]

ক্বিয়ামতের ময়দানে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে হলে আল্লাহ ভীতি সহকারে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে। কাউকে সামান্যতম ঠকানোর মানসিকতা অন্তরে পোষণ করা যাবে না। সমাজে অনেক লোক আছে যারা মানুষকে ঠকায় কিন্তু সভা সমাজে ভাল মানুষ সাজে, একটি কথা মনে রাখুন দুনিয়ার সমস্ত মানুষকেও যদি আপনি ভুল বুঝাতে পারেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালাকে ভুল বুঝানো সম্ভব না এবং কোন কিছু লুকিয়ে রাখা সম্ভব না।

কাজেই আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন এবং আল্লাহ তায়ালার রাজি খুশির জন্য কাজ করুন যেমন সমাজে অনেক ভাই আছেন যারা মানুষের মুখ থেকে প্রশংসা শুনার জন্য সমাজের কাজ করেন,আপনার কাজটি অনেক ভাল কাজ বটে কাজটি যদি আল্লাহ্‌ তায়ালার রাজি খুশির জন্য করতেন তাহলে আল্লাহ্‌র কাছ থেকে পরকালে পুরুস্কার পেতেন কিন্তু মানুষের মুখ থেকে প্রশংসা শুনার জন্য কাজটি করার কারনে পরকালে কোন পুরুস্কার পাবেন না বরং এজন্য তিরুস্কার রয়েছে -এ ব্যাপারে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ -رضي الله عنه- قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: « إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ: جَرِيءٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ، وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ: عَالِمٌ وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِئٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّار، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ: هُوَ جَوَادٌ: فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ» . ( مسلم والنسائي ) صحيح

অর্থঃ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নিশ্চয় সর্বপ্রথম ব্যক্তি কিয়ামতের দিন যার ওপর ফয়সালা করা হবে, সে ব্যক্তি যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে, অতঃপর তাকে তার (আল্লাহর) নিয়ামত রাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। 

তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: আপনার জন্য জিহাদ করে এমনকি শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি এ জন্য জিহাদ করেছ যেন বলা হয়: বীর, অতএব বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আরও এক ব্যক্তি যে ইলম শিখেছে, শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন তিলাওয়াত করেছে, তাকে আনা হবে। অতঃপর তাকে তার নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। 

তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: আমি ইলম শিখেছি, শিক্ষা দিয়েছি ও আপনার জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেছি। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি ইলম শিক্ষা করেছ যেন বলা হয়: আলেম, কুরআন তিলাওয়াত করেছ যেন বলা হয়: সে কারী, অতএব বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আরও এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সচ্ছলতা দিয়েছেন ও সকল প্রকার সম্পদ দান করেছেন, তাকে আনা হবে। তাকে তার নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে।

তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: এমন খাত নেই যেখানে খরচ করা আপনি পছন্দ করেন আমি তাতে আপনার জন্য খরচ করি নাই। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি করেছ যেন বলা হয়: সে দানশীল, অতএব বলা হয়েছে, অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে”। [মুসলিম ও নাসায়ি] হাদিসটি সহিহ।

তাছাড়া মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মওজুদ করে রেখে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে মুনাফা লাভের প্রবণতা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنِ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ  অর্থাৎ ‘যে মওজুদদারী করে সে পাপী’ মুসলিম হা/৪২০৬।

মিথ্যা কসম করাঃ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করলে ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যবসায়ীদেরকে মিথ্যা পরিহার করার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। বিশিষ্ট ছাহাবী ওয়াসিলা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্ল­াহ (ছাঃ) আমাদের কাছে আসতেন এবং বলতেন, يَا مَعْشَرَ التُّجَّارِ إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ 

অর্থঃ ‘হে বণিক দল! তোমরা মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কারবার থেকে অবশ্যই দূরে থাকবে’। ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭৯৩। 

পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সকল ব্যবসায়ীকে মিথ্যা কসম বর্জন করতে হবে। কারণ তা ইসলামে নিষিদ্ধ। আবু কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِيَّاكُمْ وَكَثْرَةَ الْحَلِفِ فِى الْبَيْعِ فَإِنَّهُ يُنَفِّقُ ثُمَّ يَمْحَقُ অর্থঃ ‘ব্যবসার মধ্যে অধিক কসম খাওয়া হতে বিরত থেকো। এর দ্বারা মাল বেশী বিক্রি হয়, কিন্তু বরকত বিনষ্ট হয়ে যায়’। মুসলিম, মিশকাত হা/১৬০৭, ২৭৯৩।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন,‘অধিক কসম খাওয়ার প্রবণতা ব্যবসায়ের কাটতি বাড়ায়, কিন্তু বরকত দূর করে দেয়’। মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৭৯৪।

মিথ্যা কসমকারী ব্যবসায়ীদের কঠোর পরিণতি সম্পর্কে অন্য আরেকটি হাদীছে সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلاَ يُزَكِّيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ، قَالَ أَبُوْ ذَرٍّ خَابُوْا وَخَسِرُوْا مَنْ هُمْ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ الْمُسْبِلُ وَالْمَنَّانُ وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ

অর্থঃ ‘তিন শ্রেণীর লোকের সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না ও তাদের প্রতি দৃষ্টি দিবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আবূ যার বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! কারা নিরাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত ? তিনি বললেন, টাখনুর নীচে কাপড় পরিধানকারী, উপকার করে খোটা প্রদানকারী এবং ঐ ব্যবসায়ী যে মিথ্যা শপথ করে তার পণ্য বিক্রি করে’। [ মুসলিম, হা/১০৫; মিশকাত হা/২৭৯৫ ]

মিথ্যা কসমকারী ব্যবসায়ী এতই ঘৃণিত যে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে ফিরেও তাকাবেন না। প্রখ্যাত ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন একটি ছাগী নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি ছাগীটি তিন দিরহামে বিক্রি করবে? লোকটি বলল, আল্লাহ্র কসম! বিক্রি করব না। কিন্তু সে পরে সেই মূল্যেই ছাগীটি বিক্রি করে দিল। আমি এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কাছে এসে উল্লে­খ করলাম। তিনি আমার কথাগুলো শুনে বললেন, بَاعَ آخِرَتَهُ بِدُنْيَاهُ ‘লোকটি দুনিয়ার বিনিময়ে তার পরকালকে বিক্রি করে দিয়েছে’। সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৬৪।

ব্যবসা-বাণিজ্যের ন্যায় একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। দ্রব্যের কোন দোষ-ত্রূটি থাকলে ক্রেতার সম্মুখে তা প্রকাশ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই লাভবান হবে এবং তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। 

কোন প্রকার গোপনীয়তার আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পণ্যে ভেজাল দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিতে নিষেধ করেছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيْهَا فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلاً فَقَالَ مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ، قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ أَفَلاَ جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَىْ يَرَاهُ النَّاسُ مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّىْ

অর্থঃ ‘একদা নবী করীম (ছাঃ) কোন এক খাদ্যস্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যস্তূপে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে দেখলেন তার হাত ভিজে গেছে। তিনি বললেন, হে খাদ্যের মালিক! ব্যাপার কি ? উত্তরে খাদ্যের মালিক বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! বৃষ্টিতে উহা ভিজে গেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, ‘তাহ’লে ভেজা অংশটা শস্যের উপরে রাখলে না কেন? যাতে ক্রেতারা তা দেখে ক্রয় করতে পারে। নিশ্চয়ই যে প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়’।[ মুসলিম; মিশকাত হা/২৮৬০]

রাসূলুল্ল­াহ (ছাঃ) আরো বলেন, اَلْبَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا أَوْ قَالَ حَتَّى يَتَفَرَّقَا فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا بُوْرِكَ لَهُمَا فِي بَيْعِهِمَا وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا

অর্থঃ ‘ক্রেতা বিক্রেতা যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, ততক্ষণ তাদের চুক্তি ভঙ্গ করার ঐচ্ছিকতা থাকবে। যদি তারা উভয়েই সততা অবলম্বন করে ও পণ্যের দোষ-ত্রূটি প্রকাশ করে, তাহলে তাদের পারস্পরিক এ ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি তারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং পণ্যের দোষ গোপন করে তাহ’লে তাদের এ ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত শেষ হয়ে যাবে’। [ বুখারী, হা/২০৭৯; মুসলিম হা/১৫৩২]

প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ক্রয়ের ইচ্ছা না থাকলে কেবলমাত্র আসল ক্রেতাকে প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী করে দেওয়া ইসলামে মারাত্মক অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لاَ تَنَاجَشُوْا 

অর্থঃ ‘তোমরা ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়ার লক্ষ্যে ক্রেতার মূল্যের উপর মূল্য বৃদ্ধি করে ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ো না’। [ বুখারী, মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১৫৮১]

কারণ তা ধোঁকাবাজির অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি যত সামান্যই হোক ক্রয়-বিক্রয়ের সময় তা বর্জন করা উচিত। ব্যবসা-বাণিজ্যের ন্যায় একটি মহৎ পেশায় নিয়োজিত লোকদের বৈশিষ্ট্য তেমন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এ ব্যাপারে হাসান বিন ছালিহর ক্রীতদাসী বিক্রয়ের ঘটনাটি একটি অনন্য উদাহরণ।

হাসান বিন ছালিহ একটি ক্রীতদাসী বিক্রয় করলেন। ক্রেতাকে বললেন, মেয়েটি একবার থুথুর সাথে রক্ত ফেলেছিল। তা ছিল মাত্র একবারের ঘটনা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার ঈমানী হৃদয় তা উল্লে­খ না করে চুপ থাকতে পারল না, যদিও তাতে মূল্য কম হওয়ার আশংকা ছিল। [ ইসলামে হালাল হারামের বিধান, পৃঃ ৩৪০। ]

ওজনে কম দেয়াঃ ক্রেতা বিক্রেতা উভয়কে ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তাহলে ইহ-পরকালে কল্যাণ ও মুক্তিলাভ সম্ভব হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ওজন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেওয়ার সময় বেশী নেওয়া এবং দেওয়ার সময় কম দেওয়া ইসলামে মারাত্মক অপরাধ। এ ধরনের ব্যবসায়ীদের ধ্বংস অনিবার্য। মহান আল্লাহ বলেন,

وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِيْنَ، اَلَّذِيْنَ إِذَا اكْتَالُوْا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُوْنَ، وَإِذَا كَالُوْهُمْ أَوْ وَزَنُوْهُمْ يُخْسِرُوْنَ، أَلاَ يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوْثُوْنَ، لِيَوْمٍ عَظِيْمٍ، يَوْمَ يَقُوْمُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ

অর্থঃ ‘যারা ওজনে কম দেয় তাদের জন্য ধ্বংস। তারা যখন লোকদের কাছ থেকে কিছু মেপে নেয়, তখন পুরাপুরি নেয়। আর যখন তাদের মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম করে দেয়। তারা কি ভেবে দেখে না যে, তারা সেই কঠিন দিনে পুনরুত্থিত হবে, যেদিন সকল মানুষ স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে দন্ডায়মান হবে’ (মুতাফ্ফিফীন ১-৫)

আল্লাহ তায়ালা অনত্র বলেন, وَأَقِيْمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلاَ تُخْسِرُوا الْمِيْزَانَ অর্থঃ ‘তোমরা ন্যায্য ওজন কায়েম কর এবং ওজনে কম দিয়ো না’। (আর-রহমান ৯) বুঝা গেল যে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে কম-বেশী করা গুরুতর অপরাধ। এতে এক শ্রেণীর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এক শ্রেণীর মানুষ সাময়িকভাবে লাভবান হয়, যা ইসলামে কাম্য নয়।

ইসলামে ব্যবসার গুরুত্ব

মহান আল্লাহপাক মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। শুধু নামাজ রোজা, হজ্ব ও যাকাত আদায় করার নাম ইবাদত নয়: বরং আল্লাহ ও তার রাসূলের হুকুম অনুসারে যখন যা করা হবে তাই ইবাদত রুপে গণ্য হবে। ব্যবসা বাণিজ্য হচ্ছে হালাল উপার্জনের একটি অনন্য পন্থা। 

ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- “আল্লাহপাক ব্যবসাকে বা কেনাবেচাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন” (সূরা বাক্বারা: আয়াত ২৭৫)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ঘ্রাস করো না কিন্তু পরস্পর রাজী হয়ে ব্যবসা করা বৈধ’ (সূরা নিসা: আয়াত-২৯)।

যারা আল্লাহর বিধান অনুসারে ব্যবসা করে তারা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মর্যাদাবান। যারা আল্লাহর অন্যান্য বিধান পালন করতঃ সৎভাবে ব্যবসা করে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন “সেই সকল লোক যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেই দিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে”। (সূরা নূর: আয়াত-৩৭)।

উক্ত আয়াতে সৎ ব্যবসায়ীর পরিচয় দেয়া হয়েছে- বলা হয়েছে সৎ ব্যবসায়ী আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয় না, আল্লাহর বিধান পালনে সে সর্বদা তৎপর থাকে। একজন সৎ ব্যবসায়ী মানুষকে ওজনে কম দিতে পারে না। পণ্যে ভেজাল মিশ্রিত করে তা বিক্রি করতে পারে না। আল্লাহর বিধান পালনকারী একজন ব্যবসায়ী ব্যবসার ক্ষেত্রে কখনও কোন প্রকার প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে না। অসৎ ব্যবসায়ীরা মানুষকে ওজনে কম দেয়, পণ্যে নানা ধরণের ভেজাল মিশ্রিত করে বাজারকে অস্থির করে তুলে।

এতে করে ক্রেতাদের দুর্ভোগ চরমে পৌছে। এরা বাহ্যিক লাভবান হয় বটে; কিন্তু এদের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এদের করুণ পরিণাম সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে-“মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকের নিকট হতে মেপে লওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করেনা যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহা দিবসে (সূরা মুতাফফিফিন: আয়াত ১-৫)।

যে সকল সৎ ব্যবসায়ী সঠিকভাবে মেপে দেয়, ব্যবসার ক্ষেত্রে কোন প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নেয় না তাদের সু মহান মর্যাদা ও শুভ পরিণাম ঘোষণা করে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- “মেপে দিবার সময় পূর্ণভাবে দিবে এবং ওজন করবে সঠিক দাড়িপাল্লায়, ইহাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট” (সূরা বনি ইসরাঈল: আয়াত-৩৫)।

অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের আকণ্ঠে নিমজ্জিত আমাদের সমাজ। অবৈধ ব্যবসার ছড়াছড়ি আজ সর্বত্র। অবৈধ ব্যবসার তান্ডবে আজ লুকিয়ে যাচ্ছে হালাল ব্যবসা। আমাদের সমাজে অনেক লোক আছেন যারা তথাকথিত ব্যবসার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন। আর ব্যাংক তাদেরকে মাসিক ১০% বা ২০% হারে লাভ দিয়ে থাকে। এরা ঘরে বসেই বিনা কষ্টে এই টাকা পেয়ে থাকেন।

তারা মনে করেন এটা ব্যবসা। এটা তাদের সম্পূর্ণরুপে ভুল ধারণা। আসলে এটা সুদ। এই সুদকে তারা খোড়া যুক্তি দিয়ে ব্যবসা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। ব্যবসার নাম নিয়ে সুদের লেনদেন করছেন আমাদের সমাজের অনেকে। এদের পরিণাম অত্যন্ত করুণ। 

এদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “তাদের অনেককেই তুমি দেখবে পাপে সীমালংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে (সুদ, ঘুষ-দুর্নীতিতে)” তৎপর: তারা যা করে নিশ্চয়ই তা নিকৃষ্ট” (সূরা মায়িদা: আয়াত-৬২)। ব্যবসা তো হচ্ছে সেটা যাতে টাকা বিনিয়োগ করা হয়, চিন্তা ফিকির ও পরিশ্রম করা হয় এবং লাভ ক্ষতি উভয়টাকে সর্বান্তকরণে মেনে নেয়া হয়।

চিন্তাফিকির নেই, পরিশ্রম নেই, কোন প্রকার ক্ষতিকে মেনে নেয়া হয় না- সেটাকে কোন বিবেকে ব্যবসা বলা হয়? ব্যাংক থেকে ২০% বা ৩০% লাভে বিনা পরিশ্রমে যা পাওয়া যায় তা সরাসরি সুদ। সুদকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন- “সুদের গুনাহের সত্তরভাগের ক্ষুদ্রতম ভাগ এই পরিমাণ যে, কোন ব্যক্তির নিজের মাকে বিয়ে করে” (মিশকাত শরীফ: পৃষ্ঠা-২৪৬)। হযরত জাবের রা. বর্ণিত হাদীসে আছে- সুদ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপরই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের লা’নত। (মুসলিম)।

ইসলামে হালাল ব্যবসার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যবসা করার সময় ক্রেতার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করলে ব্যবসায়ীর প্রতি আল্লাহ অত্যন্ত খুশী হন। তাকে জান্নাত দান করেন।

হযরত আবু হুজায়ফা রা. বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের এক ব্যক্তির কাছে মালাকুল মাউত রুহ কবজ করার জন্য উপস্থিত হলেন- মালাকুল মউত তাকে জিজ্ঞেস করলেন- দুনিয়ার জীবনে তুমি কোন বিশেষ নেক আমল করেছ কি? সে বলল- আমার স্মরণ নেই- তবে একটি আমলের কথা স্মরণ হচ্ছে- আর তা হল দুনিয়ার জীবনে আমি লোকদের সাথে ব্যবসা করতাম। ব্যবসা ক্ষেত্রে আমি লোকদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতাম।

আমার খাতক ধনী হলে আমি তাকে সময় দান করতাম। আর খাতক গরীব হলে আমি আমার প্রাপ্য মাফ করে দিতাম। ঐ আমলের বদৌলতে আল্লাহপাক তাকে জান্নাত দান করেছেন’ (বুখারী ও মুসলিম)। সৎ ব্যবসায়ির শান-মান বর্ণনা করে হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন- “সত্যবাদী আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ী ব্যক্তি কিয়ামতের দিনে নবীগণ সিদ্দিকগণ এবং শহীদগণের দলে থাকবেন” (তিরমিজী, দারে কুতনী, ও দারেমী)।

সুদ ব্যবস্থা আমাদের অর্থনৈতিক দুর্গতির মূল কারণ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তরান্বিত করার লক্ষ্যে সকল প্রকার সুদী লেনদেনের প্রতি লাত্থি মেরে হালাল ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করা আমাদের সকলের উচিত। এই দুনিয়া তো ক্ষণিকের, পরের জীবনে আমাদের সব কিছুর জন্যই জবাব দিতে হবে। চরম বাস্তব এই চিন্তাটা আমাদের মধ্যে যেদিন আসবে, সেদিনই মুসলিমরা রক্ষা পাবে সুদ নামক ভয়ংকর আগুনের হাত থেকে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সুদ ও হারাম থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

শেষ কথা - ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম

আমাদের সমাজে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী রয়েছেন। যারা নানা অসৎ উপায়ে মানুষকে ধোকা দিয়ে টাকা উপার্জন করছেন। এই উপার্জিত সম্পদ গুলো কখনোই হালাল হবে না আর এগুলোর হিসাব পরপারে দিতে হবে। আমরা দুনিয়াতে যে কাজই করে না কেন সব সময় আমাদের মৃত্যুর পরের জীবন এর কথা মনে রাখতে হবে ইসলাম খুবই সহজ একটা বিষয়।

কিন্তু আমরা মানুষরা এটাকে খুব কঠিন করে নেই। ইসলামে কিছু গণ্ডি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্য থেকে আমরা যাই করি না কেন সবকিছুই ইনশাআল্লাহ হালাল হবে। সবশেষে বলা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীকে সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে, অবৈধ উপার্জন ও লোভ-লালসাকে সংবরণ করতে হবে। 

আর এটাই ইসলামের দাবী। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সততার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করে ইহকালে আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন ও পরকালে মুক্তি লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন!! ইসলামে ব্যবসা করার নিয়ম লেখাটি কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন।

0 Comments

* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.??