গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় | গরুর খামার পরিকল্পনা

স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করার পরেও বাংলাদেশের যুবক বেকাররা যখন চাকরি না পায় তখন তারা ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার পিছনে। আর বাংলাদেশে এমন অনেক তরুণ যুবক রয়েছে যারা নতুন করে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য চাকরির পিছনের না দৌড়ে গরুর খামার করছে।

তবে বেশ কয়েক বছর ধরে তরুণদের গরুর খামার করার প্রতিযোগিতা লাগলেও অনেক আগে থেকে গ্রাম বাংলার কৃষকেরা গরুর খামার করছে। অনেকেই আছেন যারা গরুর খামার করতে চান। এবং গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় কি?

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায়

(toc) #title=(সূচিপত্র)

আজকে আর্টিকেলে আমি গরুর খামার নিয়েই আলোচনা করতে যাচ্ছি। যারা গরুর খামার সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জানতে চান আশা করি আজকের আর্টিকেলটি পড়ে আপনারা অনেকেই উপকৃত হবেন। তাহলে চলুন শুরু করা যাক।

গরুর খামার করতে কত টাকা লাগে

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় সম্পর্কে জানার আগে আমরা আগে একটু ধারণা নিব গরুর খামার করতে কত টাকা লাগে বা গরুর খামার করতে কেমন খরচ হয়? অনেকের মনে জানার জন্য ব্যাপক আগ্রহ থাকে যে গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় কি? আর এই আগ্রহ থেকেই অনেকেই জানতে চাই গরুর খামারে কেমন খরচ হয়।

আমি যদি অল্প কথাই বলি গরুর খামার করতে কত টাকা লাগে? তাহলে আমি বলব আপনার পুঁজি যতটুকু খামার করতেও খরচ হবে ঠিক ততটুকু। তবে ন্যূনতম আপনার কাছে যদি পাঁচ লক্ষ টাকা থাকে তাহলে আপনি একটি সুন্দর গরুর খামার করতে পারবেন।

এই পাঁচ লক্ষ টাকার মধ্যেই আপনি গরুর খামারের ঘর এবং বেশ কিছু গরু ও শুরুর দিকে গরুর প্রয়োজনীয় কিছু খাদ্য কিনতে পারবেন। ধরুন আপনার পুঁজি হলো ৫ লক্ষ টাকা। এবার আপনি ছোট কিংবা মাঝারি সাইজের ৪-৫ টি গরু কিনে আনবেন তিন লক্ষ বা সাড়ে তিন লক্ষ টাকার মধ্যে।

আর বাকি টাকায় গরুর থাকার ঘর, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন গরুর খামার পরিষ্কার করার সরঞ্জাম, গরুকে গোসল বা পরিষ্কার করানোর সরঞ্জাম এবং গরু যে পাত্রে খাদ্য খাবে সে সকল পাত্র এবং শুরুর দিকের কয়েক মাসের খাবার।

অর্থাৎ আপনি যদি একটি আদর্শ গরুর খামার করতে চান তাহলে চার থেকে পাঁচটি গরু দিয়ে গরুর খামার করতে গেলে আপনার খরচ পড়বে প্রায় ৫ লক্ষ টাকার মত।

আরো পড়ুনঃ টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যায় কেন

কোন গরু পালনে লাভ বেশি

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় সম্পর্কে জানার আগে আমরা আগে জেনে নিব কোন গরু পালনে লাভ বেশি ? অর্থাৎ আপনি যখন গরুর খামার শুরু করবেন তখন কোন জাতের গরু গুলো পালন করবেন?

আপনি যদি গরুর খামার করে লাভবান হতে চান তাহলে গরু পালনের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের গরুর কোন বিকল্পই নেই। কারণ উন্নত জাতের গরুগুলো আমাদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে অধিক দুধ দেয় এবং এদের দেহে দ্রুত অনেক মাংসও বাড়ে।

আর উন্নত জাতের গরুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো - ফ্রিজিয়ান, হলস্টেইন, সিন্ধি জার্সি, শাহীওয়াল, ব্রাহমা ইত্যাদি।

যদি খামার শুরু করার চিন্তাভাবনা থাকে তবে এই জাতের গরুগুলো দিয়ে আপনি আপনার খামারটি সাজাতে পারেন। এর কারণ হলো এগুলো প্রত্যেকটি হল উন্নত জাতের গরু। আর উন্নত জাতের গরু মানেই অধিক পরিমাণে দুধ এবং অধিক পরিমাণে দেহে মাংস থাকবে।

আরো পড়ুনঃ টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যায় কেন

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায়

যারা গরুর খামার করতে চান কিংবা ইতিমধ্যেই যারা গরুর খামার করছেন তাদের সবার মনেই একটি প্রশ্ন গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় কি? উপায় গুলো নিম্নে দেয়া হলোঃ

  • উদ্দেশ্য ঠিক করাঃ প্রতিটা কাজের ক্ষেত্রেই প্রথমেই উদ্দেশ্য ঠিক করে নেওয়া অপরিহার্য। সুতরাং আপনি যখন ঠিক করেন আপনি গরুর খামার করবেন তাহলে আপনাকে সেই উদ্দেশ্যটি ঠিক করে নিতে হবে।
  • গরুর সঠিক জাত নির্বাচন করঃ উদ্দেশ্য ঠিক করার পর আপনার হাতে যে কয়টা টাকা রয়েছে কিংবা যতটুকু পুঁজি রয়েছে সে টাকা ব্যয় করে সঠিক জাতের গরু নির্বাচন করে কিনে নেওয়া। আর কোন জাতির গরু কিনলে লাভবান হওয়া যায় তাতো আমি বলেই দিয়েছি।
  • ব্যবস্থাপনা করাঃ সঠিক ভাবে খামার পরিচালনা করার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অত্যন্ত জরুরী। তাই প্রত্যেকটি ফার্মেই গরুর সঠিক দেখাশোনার জন্য একটি তালিকা বা চার্ট তৈরি করে নিতে হবে।
  • খামার দেখাশোনা করার লোক রাখাঃ একটি খামার পরিচালনা করা কখনোই মুখের কথা না। তাই গরুর সঠিক পরিচর্যা ও সঠিক লালন পালনের জন্য এক, দুই অথবা ততোধিক লোক রাখা প্রয়োজন।
  • গরুর খাবারের জন্য খরচ করাঃ গরু বেঁচে থাকবে এবং বৃদ্ধি পাবে খাবারের উপর। তাই চেষ্টা করতে হবে গরুকে যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো। যাতে গরুর ওজন বাড়ে এবং অধিক পরিমাণে দুধ দেয়। তাই গরুর খাবারের পেছনে কৃপণতা না করে অবশ্যই ব্যয় করতে হবে।
  • সময় দেওয়াঃ আপনি যখন একটি ব্যবসা শুরু করবেন তখন আপনাকে শুরুর দিকে অনেকটা পরিমাণে সময় দিতে হবে। গরুর খামারের ক্ষেত্র তার ব্যতিক্রম নয়। আপনি যদি লাভবান হতে চান তবে অবশ্যই আপনাকে গরুর খামারের সময় দিতে হবে।
  • ধৈর্যশীল হওয়া এবং সফলতার জন্য চেষ্টা করাঃ চেষ্টা করবেন যেকোনো পরিস্থিতি ধৈর্য সহকারে মোকাবেলা করতে এবং সফলতার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করতে।

আর এই উপায়গুলো যদি আপনি অবলম্বন করতে পারেন তবে অবশ্যই আপনি একজন সফল খামারি হবেন। ইনশাআল্লাহ

আরো পড়ুনঃ টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যায় কেন

কম খরচে গরু পালন

যারা গরুর খামার করার চিন্তা করছেন কিংবা যারা ইতিমধ্যেই গরুর খামার শুরু করেছেন তাদের মনেই সবসময় একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খায় গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় কি বা কম খরচে গরু পালন কিভাবে করব? উপরে তো আমি বলে দিয়েছি যে কোন গরু পালনে বেশি লাভ হয়। আর এবার আমি বলবো কম খরচে গরু পালন কিভাবে করবেন।

আপনি যদি গরুর খামার শুরু করতে চান তাহলে আপনাকে দেখতে হবে আপনার পুঁজি ঠিক কতটুকু আছে। এই পুঁজির উপর ভিত্তি করেই আপনি প্রথমে কয়েকটি গরু কিনবেন। আপনি চাইলে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা দিয়ে শুরু করতে পারেন।

এবার আপনি এমন গরু কিনবেন যে গরু গুলো কেনা খাদ্য খাওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক খাদ্য অর্থাৎ ঘাস লতা পাতা, কচুরিপানা ইত্যাদি খাবার গুলো অধিক পরিমাণে গ্রহণ করে।

এমন ধরনের গরু নির্বাচন করলে আপনার খাদ্য কেনার টাকার পরিমান কমে আসবে। আপনি যে টাকা গরুর খাবার কেনার পিছনে ব্যয় করতেন সে টাকা কিছু হলেও বাঁচবে।

এরপর এমন ধরনের গরু বাছাই করবেন যেগুলো বছর শেষে বাচ্চা প্রসব করবে। ফলে আপনার খামারে নতুন গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং খামারও ধীরে ধীরে বড় হবে। গরু খুব দ্রুত মোটা হয় এমন ধরনের খাবার না খাইয়ে চেষ্টা করবেন ঘাস লতাপাতা, কচুরিপনা ইত্যাদি জাতীয় খাবার গুলো খাওয়াতে। আর অবশ্যই এই ঘাস, লতাপাতার চাষ প্রয়োজনে খামারে পাশে একটি মাঠ রেখে সেখানে করবেন।

আরো পড়ুনঃ টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যায় কেন

দেশি গরু পালন পদ্ধতি ও দেশি গরুর খামার

গরুর খামার করে লাভবান হওয়ার উপায় তো এতক্ষনে জেনে গেলেন। এবার জানাবো কিভাবে দেশি গরু পালন করবেন। অর্থাৎ দেশি গরু পালন পদ্ধতি ও দেশি গরুর খামার সম্পর্কে এবার আলোচনা করতে চাচ্ছি।

আপনি যদি বেশি গরু নিয়ে গরুর খামার করতে চান তাহলে প্রথমেই আপনাকে আপনার যা পুঁজি আছে সে পুঁজির অর্ধেক অংশ দিয়ে কয়েকটি দেশী গরু কিনতে হবে। এবং আপনি যে কয়টি গরু কিনবেন সে কয়টি গরুর জন্য একটি ঘর তৈরি করে নিতে হবে। এবং চেষ্টা করবেন ঘরটি এমন জায়গায় বানাতে যার পাশেই একটি খোলা মাঠ রয়েছে। এবং সেই মাঠে থাকবে বিভিন্ন রকম লতা পাতা এবং ঘাস। যেগুলো গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

গরু ক্রয় এবং ঘর তৈরীর পর প্রয়োজনীয় বেশ কিছু সরঞ্জাম প্রয়োজন হয় সে সরঞ্জামগুলো কিনে নিবেন। এবং বিশুদ্ধ পানি সরবারাহের ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া গরুর ঘর বা আবাসন স্বাস্থ্যসম্মত করতে নিয়মিত কৃমিনাশক চিকিৎসা ও টিকা প্রদানের ব্যবস্থাও করতে হবে।

এবার হলো গরুর খাদ্যের পালা। দেশী গুরু পালনের ক্ষেত্রে গরুকে যে খাবারগুলো খাওয়াবেনঃ

  • প্রথমেই দেশি গরু পালনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচা ঘাস, পরিমিত প্রক্রিয়াজাত খড়, দানাদার খাদ্য যেমন- (গমের ভুষি, ভুট্টা ভাঙ্গা, কলাই, খৈল, মটর, খেশাড়ী, কুড়া,ইদ্যাদি) পর্যপ্ত পরিমানে গরুকে খাওয়াতে হবে।
  •  শর্করা জাতীয় খাদ্য বেশি দিতে হবে যেমন: ভুট্টা, ভাত, গম, চালের কুড়া ইত্যাদি।
  • খাদ্য উপকরনে যেই সকল পুষ্টি উপাদানগুলো অধিক পরিমানে থাকবে সেগুলো গরুকে দিতে হবে।
  • ভিটামিন জাতীয় খাদ্য খাওয়াতে হবে। 
  • বেশি করে খনিজ জাতীয় খাদ্য গরুকে দিতে হবে যেমন ক্যালশিয়াম ফসফেট, লবন ইত্যাদি।
  • সয়াবিন মিল, তিলের খৈল ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাদ্যগুলো গরুকে খাওয়াতে হবে।
  • অবশ্যই দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি দিতে হবে।

গরুর খামারের লাভ কেমন বা গরুর খামার কি লাভজনক

গরুর খামারে লাভ কেমন অথবা গরুর খামার কি লাভজনক এরকম প্রশ্ন গরুর খামার করতে আগ্রহীদের মনে অনেক আসে। আসলে কোন কাজই কিন্তু সহজ নয় এবং কোন কাজের সফলতাটাই দ্রুত আসে না।

আপনি যদি সঠিক নিয়মে গরু পালন করে থাকেন এবং গরু পালনের দিক নির্দেশনা গুলো সঠিকভাবে পালন করতে পারেন তবে অবশ্যই আপনি গরুর খামার থেকে লাভবান হবেন।

আজকাল বাংলাদেশের লাখো তরুণ চাকরি না করে এই গরুর খামার করার পেছনে ছুটছেন। এর অন্যতম কারণ হলো তারা এখান থেকে লাভবান হচ্ছেন। আর একজনের দেখাদেখি করে আরেকজন গরুর খামার দিতে আগ্রহী হচ্ছেন।

আপনি যদি সঠিকভাবে গরুর খামার করতে পারেন তবে গরুর খামার আপনার জন্য একটি লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়াবে। কেননা একমাত্র গরুর খামার করতে গেলেই আপনি স্বল্প পুঁজি অর্থাৎ কমপক্ষে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা নিয়েই আপনি শুরু করতে পারেন। এবং সঠিক দিকনির্দেশনা এবং বেশ কিছু টেকনিক অবলম্বন করেই আপনি গরুর খামার করে লাভবান হতে পারে। সুতরাং বলাই যায় গরুর খামার একটি লাভজনক ব্যবসা।

পোষ্ট ক্যাটাগরি:

এখানে আপনার মতামত দিন

0মন্তব্যসমূহ

আপনার মন্তব্য লিখুন (0)