ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশক

হাসিবুর
By -
0

ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশক: ধান বাংলাদেশের প্রধান শস্য। কারণ এদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। আর ধান থেকেই চাল এবং চাল থেকে ভাত পাই। বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া ধান চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তাই সারাদেশেই নানা জাতের ধান চাষ হয়। কিন্তু ধান লাগালে যদি আশানুরূপ ফসল না পাওয়া যায় তাহলে কৃষকের তথা দেশের আর্থিক ক্ষতি হয়।

ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশক

আর প্রত্যাশা অনুযায়ী ফসল না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ধান গাছে পোকার আক্রমণ। ধান গাছের সবচেরে বড় ক্ষতি করে মাজরা নামক এক ধরনের পোকা। এর ফলে ফলন অনেক কমে যায়। তাই কৃষক এই পোকার আক্রমণ থেকে ধানকে রক্ষা করতে নানা ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করে। ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশকের নাম বিষয়েই আজকের আর্টিকেলটি।

(toc) #title=(এক নজরে সম্পূর্ণ লেখা পড়ুন)

ধানের মাজরা পোকা কি?

মাজরা পোকা

ধান গাছের বড় শত্রু মাজরা নামক একটি পোকা। এই পোকাটির আক্রমণে ধানের উৎপাদন অনেক কমে যায়। এজন্য মাজরা পোকাটি চেনা ধান চাষীদের জন্য খুবই দরকার। কারণ ধান গাছে আরও পোকামাকড় আক্রমণ করে। কিন্তু সব পোকা আবার সমান ক্ষতি করে না।

সব মাজরা পোকা নিশাচর। দিনের বেলা পাতার নিচে লুকিয়ে থাকে। রাতে অন্ধকারে এরা বের হয়ে চলাফেরা করে। আর রাতে সবাই আলো দেখলে আকৃষ্ট হয়। ধান গাছে ৩ ধরনের মাজরা পোকা আক্রমণ করে। যথা: হলুদ রঙের মাজরা পোকা, কালো মাথার মাজরা পোকা, গোলাপি রঙের মাজরা পোকা।

১. হলুদ মাজরা পোকা

বাংলাদেশে ধানগাছে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে হলুদ রঙের মাজরা পোকা। এই পোকাটির মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী দুই জাত আছে। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী পোকার রং হালকা হলুদ। এগুলোর ডানার উপর ২টি কালো দাগ থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পোকার রং হালকা বাদামি। এগুলোর সামনের ডানার কিনারে অনেকগুলো ছোট ছোট ধূসর বর্ণের ফোঁটা থাকে। এই পোকাগুলো লম্বায় প্রায় ১৩-১৬ মিলিমিটার।

২. কালো মাথার মাজরা পোকা

হলুদ মাজরা পোকার পরে এই জাতের আরেকটি ক্ষতিকর পোকা হলো কালো মাথার মাজরা পোকা। এটি দেখতে হলুদ মাজরা পোকার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কীড়ার রং কালো হওয়ায় একে কালো মাথার মাজরা পোকা বলে। এরা কখনও সুপ্ত বা লুকিয়ে থাকে না।

৩. গোলাপি মাজরা পোকা

গোলাপি মাজরা পোকা মূলত ফ্যাকাশে হলুদ ও বাদামী রঙের। এর কীড়ার রং গোলাপি তাই এই রকমের নামে নামকরণ হয়েছে। এই ধরনের পুরুষ মাজরা পোকা লম্বায় প্রায় ১৬-২০ মিলিমিটার, স্ত্রী মাজরা পোকা লম্বায় প্রায় ২০-৩১ মিলিমিটার।

আরো পড়ুনঃ ইনতেফা কীটনাশক তালিকা

মাজরা পোকা কীভাবে ধানের ক্ষতি করে

মাজরা পোকা ক্ষতিকর পোকা। এর আক্রমণে ধান গাছের ফসলের পরিমান ৩০%-৭০% কমে যায়। এই পোকা ধান গাছের কাণ্ডের ভেতরে ভক্ষণকারী একটি পোকা। এরা গাছের কাণ্ডের ভেতরে ঢুকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলে। এরপর গাছের ডিগ পাতার গোড়া খেয়ে ফেলে। এতে ধানের ডিগ পাতা মরে যায়। এই রোগের নাম “ডেডহার্ট” বা “মরাডিগ”।

ধান গাছে ছড়া বা শীষ আসার আগে যদি এই পোকা আক্রমণ করে তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।তবে শীষ আসার পরে যদি পোকার আক্রমণ হয় তাহলে শীষ মরে যায়। এই রোগের নাম “ডেড হেড” বা “মরাশীষ”। ফলে ফলন আশাতীত কমে যায়। 

মাজরা পোকা দমনের উপায় - ধানের মাজরা পোকা দমনে করণীয়

যেহেতু মাজরা পোকা ধান গাছের ব্যাপক ক্ষতি করে তাই এই পোকা দমন করতে হবে। নাহলে ধানের ফলন কম হবে। এই পোকা দমন করার হলে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুটি পদ্ধতি আছে।

প্রাকৃতিক উপায়

ধানের মাজরা পোকা দমনে পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক উপায়। এটি অনেক প্রাচীন পদ্ধতি।

১। ধানের ক্ষেতে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে ডাল বা ইংরেজি T অক্ষরের মতো দেখতে লাঠি জমিতে পুঁতে রাখতে হবে। ইংরেজি T অক্ষরের মতো দেখতে লাঠি হলে পাখি এসে বসতে পারে। পাখি এসে এসব ডাল বা লাঠির উপর সহজেই বসতে পারবে। যেসব পাখি পোকাখেকো সেসব পাখি তখন এখানে এসে বসে আর পোকা খায়। বিশেষ করে এরা পূর্ণবয়স্ক মথ (মাজরা পোকা) খেয়ে থাকে। এভাবে এদের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে। এটা ধানের চারা লাগানের পরপরই করা উচিৎ।

২। আরেকটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি হলো ধান ক্ষেত থেকে ২০০-৩০০ মিটার দূরে আলোক ফাঁদের মাধ্যমে পোকা দমন। কারণ আমরা জানি মাজরা পোকা নিশাচর বা রাতে চলাফেরা করে। আর আলো দেখলে সেখানে চলে আসে। এজন্য আলোক ফাঁদ বা লাইটের মাধ্যমে আলোর সৃষ্টি করতে হবে। মাজরা পোকা ক্ষেত থেকে আলোর দিকে চলে আসবে। তখন এই পোকার মথ সংগ্রহ করে মেরে ফেলা যাবে। ইদানীং এই পদ্ধতিতে কৃষকেরা বেশ সফল হচ্ছেন।

৩। নিয়মিতভাবে ক্ষেতে নেমে মাজরা পোকার মথ ও ডিম নষ্ট করে ফেলে মাজরা পোকার সংখ্যা ও ক্ষতি কমানো যায়।

৪। ধানের শীষ আসার আগ পর্যন্ত হাতজাল দিয়ে পোকা ও মথ ধরে মেরে ফেলা যায়।

আরো পড়ুনঃ বাংলাদেশের সেরা কীটনাশক কোম্পানির তালিকা

কৃত্রিম উপায়

ধানের মাজরা পোকা দমনের বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি হলো কৃত্রিম উপায়। এটিই সবাই ব্যবহার করে। এই উপায়ে সাধারণত কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগ করে পোকা দমন করা হয়। কীটনাশক স্প্রে করে প্রয়োগ করা হয়। আর ধানগাছে মাজরা পোকার আক্রমণ কত শতাংশ সেটা অনুযায়ী কীটনাশক দিতে হবে।

সতর্কতা: ধানক্ষেতে মাজরা পোকা নিধনে একই গ্রুপের কীটনাশক প্রতিবার বয়বহার করা যাবে না। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন গ্রুপেরটা ব্যবহার করতে হয়। ফসল পাওয়ার পর মরা ধান গাছ বা নাড়া আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। এতে করে মথ বা ডিম থাকে তা ধ্বংস হয়।

মাজরা পোকা দমনে করণীয়

রোপা আমন সহ ধানের মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় মাজরা পোকার আক্রমণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাজরা পোকা দমনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়-

  • মাজরা পোকার ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলা।
  • মাজরা পোকার মথকে আলোক ফাঁদ আকৃষ্ট করে মেরে ফেলা।
  • যে সব এলাকায় প্রতি বৎসর মাজরা পোকার আক্রমণ হয় সেসব এলাকায় আমন ধান কাটার পর নাড়া চাষ/পুড়িয়ে কীড়া ও পুত্তলি নষ্ট করা যায়।

এছাড়া প্রতি বর্গ মিটারে ২-৩টি স্ত্রী মথ বা ডিমের গাঁদা অথবা গাছ মাঝারি কুশি অবস্থায় রোপনের ৪০ দিন পর থেকে) থোড় আসা পর্যন্ত ১০-১৫% মরা ডিগ অথবা ৫% মরা শিষ দেখা গেলে নিম্নেলিখিত গ্রুপের যে কোন কীটনাশক বা অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাজরা পোকা দমনে করণীয়

কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, একই গ্রুপের কীটনাশক একই পোকা দমনের জন্য পর্যায়ক্রমে/প্রতি মৌসুমে ব্যবহার না করে বিভিন্ন গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।

ধানের পোকা দমনের জন্য যে সমস্ত গ্রুপের কীটনাশক করা যাবে না-

  • সাইপারমেথ্রিন
  • আলফা-সাইপারমেথ্রিন
  • ল্যামডা-সাইহেলোথ্রিন
  • ডেলথামেথ্রিন
  • ফেনভালারেট

কারণ এ সমস্ত গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহারে পোকার (Resurgence) ঘটে। এছাড়া যে কোন অনুমোদিত কীটনাশক। যেমন- ক্লোরপাইরিফস এর সহিত উপরে উল্লেখিত যে কোন গ্রুপের মিশ্রন ধানের পোকা দমনের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। যেমন- বিউটি, ক্যারাটে, কারফু, সাবসাইড, মিক্সার, ডেয়ার, এটম, কেনভস, সুপারফাস্ট, বর্ডার, দূর্বার, নাইট্রো ও আলটিমা ইত্যাদি।

ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশক

বাজারে ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশক অনেক রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম ও ব্যবহার নিচে দেওয়া হলো।

ধানের চারা লাগানোর ১৫ দিন পর প্রতি বিঘায় ইউরিয়ার সাথে ব্রিফার (৫ জি): ১.৩ কেজি, সালফক্স (৮০ ডব্লিউ ডি জি) ১ কেজি করে প্রয়োগ করতে হবে।

ব্রিফার (৫ জি)

চারা লাগানোর ৪০-৪৫ দিন পর রিলোড (১৮ এস সি):

রিলোড (১৮ এস সি)

৫ মিলি প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।প্রতি একরে ১০০ মিলি করে দিতে হবে।

এছাড়াও অন্যান্য কার্যকরী কীটনাশক হলো:

১। এসিমিক্স (৫৫ ই সি):

এসিমিক্স (৫৫ ই সি)

১০ মিলি প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি একরে ২০০ মিলি করে দিতে হবে।

২। ল্যামিক্স (২৪.৭ এস সি):

ল্যামিক্স

২০ মিলি প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি একরে ৪০০ মিলি করে দিতে হবে।

৩। গোলা (৪৮ ই সি):

গোলা

১০ মিলি প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি একরে ২০০ মিলি করে দিতে হবে।

৪। বেনথিয়াম (৪০ ডব্লিউ ডি জি):

বেনথিয়াম

২.৫ গ্রাম প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি একরে ৫০ মিলি করে দিতে হবে।

৫। গুলী (৩ জি আর):

গুলী

প্রতি বিঘাতে ১.৩ কেজি দিতে হবে। প্রতি একরে ৪ কেজি করে দিতে হবে।

৬। সিডিয়াল (৫ জি):

সিডিয়াল

প্রতি বিঘাতে ১.৩ কেজি দিতে হবে। প্রতি একরে ৪ কেজি করে দিতে হবে।

লেখকের শেষ কথা

আজকের টপিক ধানের মাজরা পোকা দমনের কীটনাশক। ধান আমাদের প্রধান ফসল হওয়ায় এর গুরুত্ব অনেক। তাই একে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা তথা মাজরা পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুটি পদ্ধতিতেই পোকা দমন করা যায়। বাজারে মাজরা পোকা দমনকারী অসংখ্য কীটনাশক আছে। সেসব ব্যবহার করলে আশানুরূপ ধান উৎপাদন করা সম্ভব।

ব্লগ ক্যাটাগরি:

এখানে আপনার মতামত জানান

0মন্তব্যসমূহ

আপনার মন্তব্য লিখুন (0)

#buttons=(ঠিক আছে, ধন্যবাদ) #days=(20)

টেকনিক্যাল কেয়ার বিডি তে আপনাকে স্বাগতম. ❤️
Ok, Go it!